গনহত্যার বর্ণনা দিচ্ছেন নির্যাতিত রোহিঙ্গারা : এক কবরে একাধিক মৃত দেহ কবরস্থ করে পালিয়ে এসেছেন

20170907_162826.jpg

মুহাম্মদ তাহের নঈমঃ জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে গত ২৪ আগষ্টের পর থেকে এই পর্যন্ত সেনা- পুলিশের গুলিতে কমপক্ষে এক হাজার রোহিঙ্গা মুসলামান নিহত হয়েছে। শতাধিক গ্রামে গ্রামের কয়েক হাজার ঘরবাড়ী আগুনে জ¦ালিয়ে দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে আসা শরনার্থীদের বর্ণনা অনুযায়ী রাখাইনে আইন- শৃংখলা বাহিনীর হাতে নিহত মানুষের সংখ্যা এক হাজারের চেয়েও অনেক বেশি। সেখানে একটি গ্রামে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যার একটি বর্নণা দিয়েছেন মংডুর মেরুল্যা গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা। গতরাতে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার উনচিপ্রাং এলাকায় তাদের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। মেরুল্যা গ্রামের পূর্ব পাড়ার বাসিন্দা হাসিম উল্যা জানিয়েছেন, তারা ২৫ আগষ্ট শুক্রবার এক সাথে ছয়জনের মৃতদেহ কবর দিয়েছেন। এরমধ্যে চারজনকে এক কবরে আর দুই জনকে অপর একটি কবরে মাটি চাপা দিয়ে কোন মতে প্রাণ নিয়ে দেশ ছেড়েছেন। ওইদিন সকাল আটটায় সেনা পুলিশের প্রায় দেড় শতাধিক সদস্য মেরুল্যায় গুলি করতে করতে প্রবেশ করার সময় প্রায় ৫০জন যুবক ও কিশোর লাঠি সোটা নিয়ে তাদের প্রতিহত করতে জড়ো হয়। এসময় তাদের উপর এলোপাথাড়ী গুলি বর্ষণ করা হয়। যেখানে মেরুল্যা শিকদার পাড়ার চারজন এবং পূর্ব পাড়ার দুইজন নিহত হয়। আরো অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়। হাসিম উল্যা জানান, আমাদের পাড়ার(পূর্ব পাড়া) যে দুইজন নিহত হয়েছে তাদের একজন আনিস ও আর একজন জুবায়ের, দুইজনের বয়স ২০বছরের কাছাকাছি। সকাল আটটা থেকে দুপুর পর্যন্ত তারা(সেনাবাহিনী) আমাদের গ্রামে ছিলো। গুলিতে বেশ কয়েকজন মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর সবাই গ্রাম ছেড়ে পাহাড়ের দিকে লুকিয়ে যায়। তারা( সেনা- পুলিশ) চলে যাওয়ার পর সবাই গ্রামে এসে আনিস ও জুবায়েরকে মৃত দেখতে পাই, আরো কয়েকজন ছিলো গুলিবিদ্ধ, তাদেরকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাদের পাড়ার আনিস ও জুবায়েরকে এনে নুরুল হক মসজিদের পাশে কবর দেয়া হয়, তার আগে ওই মসজিদের ইমাম মাওলানা নুরুল হক তাদের জানাযা পড়ান, শতাধিক ব্যাক্তি জানাযায় অংশ নেন, তাদের দুইজনকে এক কবরে রাখা হয়েছে। স্থানীয় আলেম মাওলানা মোশতাক আহমদ ফতোয়া দিয়েছেন মগ(মিয়ানমারের সেনা- পুলিশ) সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহতরা শহীদ, তাদের গোসল ও কাফনের কাপড় ছাড়াই দাফন করা যাবে, সেই জন্য আমরা তাদের লাশের গোসল করায়নি, উল্লেখ করেন তিনি।
হাসিম উ্যল্যা বলেন, একই সময়ে পাশের শিকদার পাড়ায় একইভাবে মারা গেছে চারজন, তাদেরকে ওই গ্রামের শিকদার মসজিদের পাশে দাফন করা হয়, তাদেরকেও এক কবরেই মাটি চাপা দিতে হয়েছে। একসাথে জানাযা পড়িয়েছেন ওই মসজিদের ইমাম মৌলভী এনামুল হক। মেরুল্যা শিকদার পাড়ায় যে চারজন নিহত হয়েছে তাদের মধ্যে রফিক ও জামালের নাম পরিচয় জানেন হাশিম উল্যা। তিনি বলেন, ওই চারজনের জানাযা ও কবর দেয়ার সময় সেখানে আমি উপস্থিত ছিলাম। এই ছয়জমের মৃত্যু ও দাফনের অনুরুপ বর্ণনা দিয়েছেন মেরুল্যা পুর্ব পাড়ার বাসিন্দা রহিম উল্যা। তিনিও প্রাণ ভয়ে আশ্রয় নিয়েছেন কক্সবাজার জেলার টেকনাফে।
রহিম উল্যা বলেন, আনিস ও জুবায়েরকে দাফনের পর ঘরে চলে আসি, ভয়ে পাশের পাড়ায় যায়নি সেখানে এক সাথে চারজনকে কবর দেয়া হয়েছিলো। আনিস আমার কাছে পানি চেয়েছিলো মেরুল্যা পুর্ব পাড়ার হত্যাকান্ডের ঘটনাস্থলে ছিলেন হাসিম উল্যার ছেলে মংডুর একটি স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র মোহাম্মদ ইউসুফ। আনিস তার ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলো বলে জানিয়েছেন। মিয়ানমার থেকে আনা মোবাইল ফোন সেটে আনিসের ছবি দেখিয়ে ইউসুফ জানান, ও আমার স্কুলের বন্ধু, আমরা এক সাথে পড়ালেখা করেছি। শুক্রবার সকালে সেনাবাহিনী দেখে আমরা সবাই বাজারের মুখে জড়ো হয়েছিলাম, গাড়ী থেকে নেমেই তারা গুলি করতে করতে গ্রামে ডুকে পড়ে, আমি ও আনিস পাশাপাশি ছিলাম, আনিসের বুকে ও মাথায় গুলি লাগলে সে পড়ে যাওয়ার সময় আমি তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করছিলাম, সে আমার কাছে পানি ছেয়েছিলো, কিন্তু আমি তাকে পানি দিতে পারিনি, জুবায়ের আমার থেকে একটু দূরে ছিলো,গুলির তোড়ে হামাগুড়ি দিয়ে আরো কয়েকজনসহগ্রামের ভিতরে চলে আসি, নিহত ও আহতরা সেখানেই পড়ে ছিলো, উল্লেখ করেন মোহাম্মদ ইউসুফ। মোহাম্মদ ইউসুফ জানায়, কয়েক ঘন্টা পর গ্রামবাসীরা সবাই মিলে তাদের দুইজনকে নিয়ে আসে, তখন তারা মরে গেছে, আনিসের মাথায় ও বুকে গুলি লেগেছিলো, যখন গ্রামের ভিতর লাশ আনা হয় তখন তার গলা ও মুখে কাটা চিহ্ন ছিলো। মোহাম্মদ ইউসুফ আরো জানায়, তারপরের দিন অনেকে গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছে. আমরা আরো দুই একদিন ছিলাম, গ্রামের ১৫/২০জনের মত গুলিবিদ্ধ ছিলো, আত্মীয় স্বজনরা তাদের নিয়ে কি করবে বুঝতে পারছিলোনা, পাড়া থেকে তাদের বের করা যাচ্ছিলোনা, কারণ রাস্তার মুখে মিলিটারী ও পুলিশ অবস্থান নিয়ে ছিলো। তারা প্রথমদিন( শুক্রবার) গ্যাস লাঞ্চার মেরে কয়েকটি ঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলো, অন্য আর একটি পাড়ায় গিয়ে আমরা দুই দিন ছিলাম, আবার পাড়ায় এসে থাকার চেষ্টা করলেও পাশের গ্রামে আবারো আগুন দেওয়াতে আর থাকতে পারিনি, সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে চলে আসতে হয়েছে, জানাই ইউসুফ।
এটাই গনহত্যা
২৫ আগষ্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। অনেকেই আহত হয়ে বাংলাদেশে এসেছে চিকিৎসা নেয়ার জন্য যাদেও মধ্যে মারা গেছে কমপক্ষে ১০জন। তাছাড়া নির্যাতনের ভয়ে পালিয়ে আসার সময় নৌকা ডুবে মারা যাওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৭২জনের লাশ বাংলাদেশ উপক’লে উদ্ধার করা হয়েছে। নৌকা ডুবির ঘটনায় নিখোঁজ আছে আরো বহু রোহিঙ্গা মুসলমান। কয়েক দশক ধরে চলছে এই পরিস্থিতি। এর আগে গত অক্টোবরে চালানো দমন পীড়নেও ৩শ থেকে ৪শ রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গত ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধ ও জাতিগত নির্মূল অভিযান চালানোর হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনী ও রাখাইন সম্প্রদায়ের বিশেষ মিলিশিয়া বাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে।
১৯৪৮ সালের জাতিসংঘ কনভেশন অনুযায়ী মোট পাচ ধরনের অপরাধ ঘটলে তা গনহত্যা হিসেবে চিহ্নিত হবে। হিউম্যান রাইট ওয়াচের রিপোর্টে বলা হয়েছে গনহত্যার পর্যায়ে পড়ে এরকম পাচটি অপরাধের মধ্যে চারটি রাখাইন রাজ্যেও রোহিঙ্গাদের উপর চালানো হয়েছে।
২৫ আগষ্ট থেকে এখন পর্যন্ত সেখানে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে তা গত অক্টোবরে চালানো ধ্বংসযজ্ঞের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বর্নণায় তা স্পষ্ট। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর নির্যাতন নিয়ে গবেষণারত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আশরাফুল আজাদ বলেছেন, বছরের পর বছর ধরে রোহিঙ্গাদের উপর মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষরা রাষ্ট্রীয় মদদে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি, ক্ষেত্র বিশেষে এই ধ্বংসযজ্ঞ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ইতোমধ্যে সীমান্ত অতিক্রম করে আসা রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে যেটা ধারণা করা যাচ্ছে তা হলো তাদেরকে নির্মূল করার জন্য পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে, পালিয়ে আসা বেশির ভাগ রোহিঙ্গায় নির্বিচারে গুলি চালানোর কথা জানিয়েছে, তাদের অনেকেই স্বজন হারিয়েছে। এছাড়াও পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা যাতে তাদের বাড়ী ঘরে ফিরতে না পারে সেই জন্য সব ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে, উল্লেখ করেন তিনি। সংঘাত শুরুর আগেও সেখানে তাদের উপর মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, খাদ্য ও শিক্ষার মত মৌলিক চাহিদা পূরনে বাঁধা দেয়া হয়েছে, এসব কিছুই মানবতা বিরোধী অপরাধের পর্যায়ের পরে, উল্লেখ করেন আশরাফুল আজাদ।

তিনি বলেন, সেনা- পুলিশ গ্রামে ঢুকে মর্টার ও লাঞ্চার দিয়ে হামলার ঘটনা ঘটছে, নিরস্ত্র মানুষজনের উপর এভাবে হামলা নজির রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা ছাড়া অসম্ভব।
গত অক্টেবরের সংঘাতের পর জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন সেখানে ধ্বংসযজ্ঞের বিষয়ে তদন্ত চালানোর চেষ্টা করলেও মিয়ানমার সরকার তাতে সাড়া না দিয়ে তদন্ত দলের সদস্যদেরকে ভিসা দিতে অস্বীকার করে।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top