বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কণ্ঠরোধ করা হয়েছে

amnesty_logo_on_bangladesh_46206_1493741190.jpg

অনলাইন :
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, বাংলাদেশে গত তিন-চার বছরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পুরোপুরি কণ্ঠরোধ করা হয়েছে।

সরকার ভিন্নমতের কণ্ঠকে সুরক্ষা দিতে শুধু ব্যর্থই নয়; বরং যেসব সশস্ত্র গ্রুপ এই বিরুদ্ধ মতকে হুমকি দিয়েছে তাদের জবাবদিহিতায় আনতেও ব্যর্থ হয়েছে।

পাশাপাশি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে হয়রানি ও নতুন আইন করে তার ওপর খড়গহস্ত হচ্ছে।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের প্রাক্কালে অ্যামনেস্টি এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বুধবার বিশ্বব্যাপী মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালিত হবে।

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে মঙ্গলবার এই বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে তারা দাবি করেছে, আতঙ্ক আর দমন-পীড়নের চাপে আজকের বাংলাদেশে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর পুরোপুরি স্তব্ধ।

এতে বলা হয়, সরকার ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগারদের রক্ষা তো করতে পারেইনি, বরং নতুন একগুচ্ছ আইন প্রণয়ন করে সাংবাদিক বা ব্লগারদের স্বাধীন কাজকর্মকে অপরাধের তকমা দিতে চেয়েছে।

অ্যামনেস্টি কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে ঢাকাতে তারা এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করতে চেয়েছিল। এ লক্ষ্যে অ্যামনেস্টির কর্মকর্তারা অনেক দিন আগেই ভিসার আবেদন করলেও তা ঝুলিয়ে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত তারা ধারণা করেন, ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের আগে ভিসা পাওয়া সম্ভব নয়। তাই দিল্লিতেই এ রিপোর্ট প্রকাশ করতে হল।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাটি বাংলাদেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তাদের প্রতিবেদনটি নিজস্ব ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করেছে।

‘ভয় আর দমন-পীড়নের ফাঁদে বাংলাদেশে বিরুদ্ধ মত’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জঙ্গিদের হামলা আর হুমকির ভয়ে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ বাংলাদেশে কমে এসেছে।

সরকার ভিন্নমত পোষণকারীদের সুরক্ষা দেয়ার বদলে উল্টো নানা কৌশল ও আইনের বেড়াজালে বাকস্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করে চলেছে।

এই দুই মিলিয়ে বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এখন অনেক সঙ্কুচিত বলে উপসংহার টেনেছেন অ্যামনেস্টির বাংলাদেশবিষয়ক গবেষক ওলফ ব্লোমকভিস্ট।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলের হামলা ও হুমকি এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নে বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক রব এখন নীরব। হামলা ও হুমকির মুখে পড়া ব্লগার, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেয়ার বদলে তাদের দায়ী করে বাংলাদেশ সরকার উল্টো অপরাধীদের মদদ জোগাচ্ছে বলে অভিযোগ করছে অ্যামনেস্টি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হলেও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশে এক ধরনের স্বাধীনতা নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে। তারা বেশ কয়েকটি বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

২০১৬ সালে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নাজিমুদ্দীন সামাদ হত্যাকাণ্ডের পর ব্লগারদের লেখা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরূপ মন্তব্যের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

এতে গত কয়েক বছরে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোতে মাত্র একটির বিচারের কথা উল্লেখ করা হয়। সেটি হল ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারের বিচার, যেখানে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আটজনের সাজা হয়েছে।

জঙ্গি হামলা কিংবা হুমকির মুখে পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে নিরাপত্তা চেয়েও না পাওয়ার কথা অ্যামনেস্টিকে বলেছেন ব্লগাররা, যাদের কেউ কেউ নিরাপত্তার স্বার্থে দেশ ছাড়ার কথাও জানিয়েছেন।

বহুবার হুমকি পাওয়া এক ব্লগার অ্যামনেস্টিকে বলেন, ‘নিজের নিরাপত্তা চেয়ে আমি অনেকবার তাদের দ্বারস্ত হয়েছিলাম, কিন্তু তারা (আইনশৃঙ্খলা বাহিনী) আমাকে কোনো সহায়তা করেনি।’

অ্যামনেস্টি দাবি করেছে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার গণমাধ্যমে তার সমালোচনা ঠেকাতে নানা হস্তক্ষেপের পাশাপাশি কালাকানুনও ব্যবহার করছে।

‘বাংলাদেশ সরকার সাংবাদিকতার সঙ্গে এমন ব্যবহার করছে যেন এটা একটা অপরাধ,’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ‘তাদের জেলে পুরছে, হুমকি দিচ্ছে, ভয় দেখাচ্ছে, তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করছে। বিরুদ্ধ মত দমনে যা যা করা দরকার, তার সবই সরকার করছে।’

এর উদাহরণ হিসেবে একটি ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদকের বিরুদ্ধে ৮৩টি মামলার কথা উল্লেখ করেছে মানবাধিকার সংগঠনটি।

একজন প্রবীণ সাংবাদিককে বন্দি করার বিষয়টিও উল্লেখ করেছে অ্যামনেস্টি, যিনি শেখ হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে হত্যাচষ্টোর ষড়যন্ত্রের মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন।

অ্যামনেস্টি বলছে, বাংলাদেশ সরকার এখনও পুরনো ঔপনিবেশিক আইনের প্রয়োগ ঘটিয়ে সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। সমালোচনা বন্ধ করতে বিতর্কিত তথ্যপ্রযুক্তি আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের উদ্যোগেও উদ্বেগ জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনটি।

অ্যামনেস্টির ব্লোমকভিস্ট বলেন, বাংলাদেশে এই দমন-পীড়ন অবশ্যই বন্ধ হতে হবে। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে যারা হুমকির সম্মুখীন, তাদের নিরাপত্তা বিধানের দাবি জানিয়েছে অ্যামনেস্টি। এরপর নিবর্তনমূলক আইনগুলো সংস্কারের দাবি জানিয়েছে তারা।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top